Manabota

Manabota

শুক্রবার, ৩ আগস্ট, ২০১২

একজন আপু এবং ফেইসবুক

আপুকে প্রায়ই দেখতাম বালিশে মাথা রেখে কান্না করত। মাঝে মাঝে দেখতাম বারান্দায় দাড়িয়ে কি যেন ভাবত। মাঝে মাঝে যখন বৃষ্টি হত, দেখতাম আপু লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না করত কেউ কাছে আসলে চোখের পানি মুছে ফেলত।
ব্যাপারগুলো বাসার কেউ বুঝতে পারত না। কিন্তু আমার চোখে ঠিকই ধরা পড়ত। কখনো আপুর কাছে জানতে চাইতাম না কি হয়েছে আপুর। ভাবতাম আপুর কাছে যদি জানতে চাই তাহলে আপুর হয়ত মন খারাপ হয়ে যাবে আরও বেশি। কিন্তু সত্যি বলতে কি আমার অনেক জানতে ইচ্ছা করত কি হয়েছে আপুর??
আমার সাথে আপুর বয়সের ব্যাবধান ৭ বছরের। আপু তখন ভাসিটিতে তৃতীয় বছরের পড়ছে তখনকারা ঘটনা। আপুকে যখন কাঁদতে দেখতাম তখন আমার অনেক কান্না পেত। কেন যেন নিজের অজান্তে আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ত। আপনজন কাউকে কাঁদতে দেখলে বেশি খারাপ লাগে। আর আমার পরিবারে আপুই আমাকে সবচেয়ে বেশি আদর করত। তাই আপুর প্রতি আমার বিশেষ মায়া ছিল। আমি যা চাইতাম আপু আমাকে তা কিনে দিত। আমি যদি খুব দামি কোন খেলনা চাইতাম আপু নিজের টাকা জমিয়ে জমিয়ে আমাকে কিনে দিত। এক কথায় ধরতে গেলে আপুই আমার পৃথিবী। কিন্তু আপুর হঠাৎ এই চুপচাপ ভাবে থাকাটা আমার সহ্য হচ্ছিল না। আগে আপু কত হাসত এখন আমার কথায় উওর হ্যা হু-এর মধ্যে সীমাবন্ধ করে রাখছে আপু। আগের ঘুমানো সময় আপুর কাছে গল্প শুনে ঘুমাতে যেতাম । এখন গল্প শুনতে বললে আপু বলে,”আমি গল্প ভুলে গেছি”
মন খারাপ করে ঘুমাতে যেতাম। আর ভাবতাম আপুর কি হয়েছে? আমার এত ভাল আপুটার কি হয়েছে? বাসার অন্য সবার সাথে আপু এত বেশি মিশত না। সারা দিন নিজের বাসায় পিসি সামনে বসে থাকত না হলে পড়াশুনায় মগ্ন থাকত।
একদিন আমি ক্লাস থেকে বাসায় আসলাম । আপুর জন্য ডেইরী মিল্ক নিয়ে এসেছিলাম। আপু চকলেট খেতে অনেক বেশি পছন্দ করে। তাই ভাবলাম চুপি চুপি আপুর রুমে গিয়ে বালিশের নিচে চকলেট রেখে দিব। আপু যখন দেখবে তখন অবাক হয়ে যাবে। তাই আমি আস্তে আস্তে আপুর রুমে গেলাম। দরজা একটু ফাকা করতে দেখি আপু পিসিতে বসে আছে। আমি আস্তে আস্তে দেখলাম আপু ফেসবুকে কাউর সাথে চ্যাট করছে। আমি আবাক হয়ে দেখলাম আপু কী-বোর্ডে লিখছে আর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। আমার আসার শব্দ শুনে আপু তাড়াতাড়ি রুমাল দিয়ে চোখে মুছে বলে,” ওহ তুই ??” এরপর তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে চলে গেল। যাওয়ার সময় আপু ফেসবুক থেকে লগআউট হয়নি। আমি এই সুযোগে আপুর ফেসবুকে দেখলাম একটি ছেলের সাথে চ্যাট করছে। ছেলেটি নাম লিখা “নীল রহমান “ আমি চ্যাট গুলো পড়া শুরু করলাম।
সবশেষে লেখাটি আপু লিখছে ”তুমি কি সত্যি আমাকে রেখে চলে যাবে??”
নীল ,” হ্যা আজ থেকে আমাদের ব্র্যাক-আপ”
আমার আর বুঝতে বাকি রইল না আসলে কী হয়ছে। আপুর মন খারাপের তাহল এইটাই কারন। হঠাৎ আপু চলে আসল এবং আপু বুঝে ফেলল আমি আমার ফেসবুকে চ্যাটগুলো পড়েছি।
আমার আমার কাছে এসে আমাকে একটা চড় দিয়ে বলল, “যা বাগ এখান থেকে”।
আমি আপুর চোখ দু’টোর দিকে তাকালাম। আপুর চোখ দু’টো লাল হয়ে আছে। দেখিই বুঝা যাচ্ছে আপু অনেক কান্না কাটি করছে । আপু এই প্রথম আমাকে মারল। কখনো আমার গায়ে হাত দেয়নি আপু। সত্যি আমার অনেক খারাপ লাগব। নিজের রুমে এসে অনেকক্ষন কাঁদলাম। একটা ছেলের জন্য আপু আমাকে মারল, আমি কি এত খারাপ ইত্যাদি ইত্যাদি কত কিছু মাথায় আসা শুরু করল। সেই দিনের পর থেকে আপুর সাথে আমার দুরত্ব বাড়তে থাকল।
এর দু’মাস পরের ঘটনা।

আগে আপুর জন্য বিয়ে দেখলে আপু বলত আমি এখন বিয়ে করব না। আগে পড়াশুনা শেষ করি। আমার কি কোন পছন্দ থাকবে না ইত্যাদি টাইপের কথা বলত। কিন্তু এখন আপু সেই রকম কোন কথা বলে না । আম্মু – আব্বু যদি বলে আজ তোকে ছেলে দেখতে আসবে আপুর দেখতাম কোন ফিল ছিল না। বলত ,”ওহ আচ্ছা”।
এর কিছুদিন পর আমার আপুটির বিয়ে হয়ে গেল ব্যাংকার একটা ছেলের সাথে। বাবা -মা যা বলছে তাই করেছে। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি আপুর চোখে –মুখে সেই আনন্দ মাখা অনুভূতিটা নেই। এখনো মনে আছে বিয়ের
আগের দিন রাতে আপু কিছু সময়ের জন্য ফেসবুকে বসেছিল এবং ফেসবুক থেকে উঠে আপু ওয়াশরুমে গেল। বুঝতে বাকি রইল না আমার। সবার সামনে কান্না করার ভয়ে ওয়াশরুমে গেল। ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার পর আমি দেখি আপুর দু’চোখ লাল হয়ে আছে । সত্যি সেই দিন অনেক খারাপ লাগল। আপু সেই কান্না মাখে মুখটা আমি আজও ভুলতে পারব না। এরপর যথারীতি আপু চলে গেল অন্যের বাড়িতে। আমি বাসায় একা। আপুর সাথে মাঝে মাঝে ফেসবুকে কথা হয়। কিন্তু কখনো জানতে চাই না । বুঝতে পেরেছে ফেসবুকে কাউকে আপু খুব বেশি ভালবাসত। সেই ছেলেটির জন্য বেশি আসফোস হচ্ছে আমার আপুটির মত একজন ভাল মানুষকে হারাল। আমার সেই আগের আপুটিকে ফিরে পেতে চাই এখনো। যে আপুটি আমাকে গল্প বলে ঘুম পাড়াবে। আমার জন্য টাকা জমিয়ে খেলনা এনে দিবে। বাবা বকা দিলে আমার চোখের পানি মুছে দিবে। যখন রেজাল্টা খারাপ করতাম আপুর কাছে এসে হাউমাউ করে কান্না করতাম। আর আপু চোখের পানি মুছে দিয়ে বলত দূর বোকা কাঁদতে হয় নাই। পরের বার ভাল করবি। এটা ফেইসবুকের ঘটনা কেমন করে যেন আপুকে আমার কাছে থেকে দূরে নিয়ে গেল ।
বি:দ্র = লেখাটা র সময় অনেক আগের আপুর সেই পুরানো ঘটনাগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে আসল । আর অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। আল্লাহ তুমি আমার আপুটিকে ভাল রেখ। আর সবাইকে প্লীজ অনুরোধ কাউর জন্য নিজের মন খারাপ করে নিজেকে কষ্ট দিবেন না। বিশেষ করে করে আমার মত ছোট ভাইদের যারা আপুদের একটু আদর, একটু ভালবাসা একটু গল্প শুনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকে। যারা আপুটি কান্না মাখা মুখে দেখতে চায় না। দেখতে চায় আপনি হাসবে , গল্প করবে
এটি আমি লেখেছিলাম প্রিয়.কম এর “আমার ফেইসবুক জীবনি” নামক একটি প্রতিযোগিতার জন্য।
কিন্তু কোন পুরষ্কার পাই নি।লাইকের সংখ্যায় আমার লেখাটা পিয়েছি ছিল । মাএ ১৪০ টা লাইক পেয়েছি:(
আমার তো আর ৫০০০ বা ২০০০০ লাইক দেওয়া কোন পেইজ ছিল না যে শেয়ার করব :) আর পুরষ্কার না পাই সুন্দর এই লিখাটি আমার অনেক প্রিয় একটা লেখা যদিও এটি নিছক একটা গল্প মাএ।
অনেকদিন পর আজ সেই লেখাটি দেখে মনে হল আমার ব্লগেই লিখাটি দেইনি

গল্প : এক স্বামীর গল্প যিনি তার স্ত্রীর দিকে তাকাতেও লজ্জা পেতেন

[এ গল্পটি বলেছিলেন কার্ডিওভাসকুলার সার্জন প্রফেসর খালিদ আল জুবাইর, তারই এক লেকচারে। ]
… একবার আমি আড়াই বছরের এক বাচ্চার চিকিৎসা করি। এটা ছিল এক মঙ্গলবার এবং বুধবারে বাচ্চাটির স্বাস্থ্য বেশ ভালই ছিল। বৃহস্পতিবার সকাল ১১.১৫ এর দিকে … আমি কখনই ঐ সময়টার কথা ভুলতে পারবো না তখনকার প্রচন্ড আলোড়নের কারনে। এক নার্স আমাকে এসে জানালো যে একটি বাচ্চার হৃদযন্ত্র এবং শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। আমি তাড়াতাড়ি বাচ্চাটির কাছে গেলাম এবং প্রায় ৪৫ মিনিটের মত কার্ডিয়াক মাসাজ করলাম। এই পুরো সময়টা জুড়ে হৃদপিন্ড কাজ করে নি।

তারপর, আল্লাহর ইচ্ছায় পুনরায় হৃদপিন্ড তার স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপ শুরু করলো এবং আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। আমি শিশুটির পরিবারকে তার অবস্থা সম্পর্কে জানাতে গেলাম। আপনারা হয়ত জানেন যে, রোগীর পরিবারকে তার খারাপ অবস্থা সম্পর্কে জানানোর বিষয়টা কতটা বিব্রতকর। একজন চিকিৎসকের জন্য এটা সবচাইতে কষ্টসাধ্য কাজগুলোর একটি যদিও এর দরকার আছে। তাই আমি বাচ্চার বাবাকে খুজতে লাগলাম কিন্তু পাচ্ছিলাম না। তখন আমি বাচ্চাটির মাকে দেখতে পেলাম। আমি তাকে জানালাম যে রোগীর গলায় প্রচুর রক্তক্ষরন হৃদপিন্ডের এই হঠাৎ অচলাবস্থার কারন; আমরা রক্তক্ষরনের সঠিক কারন বলতে পারছি না এবং আশংকা করছি তার মস্তিষ্ক মরে গেছে। … আপনাদের কি মনে হয়? এ কথা শুনে বাচ্চাটির মায়ের প্রতিক্রিয়া কি ছিল? সে কি কান্না শুরু করেছিল? আমাকে দোষারোপ করছিলো? না। এমন কিছুই হয় নি। বরং তিনি বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ! (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহতা’আলার)” এবং চলে গেলেন।

প্রায় ১০ দিন পর, বাচ্চাটি নড়তে শুরু করলো। আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করলাম এবং খুব আনন্দিত হলাম এ কারনে যে তার মস্তিষ্কের অবস্থা বেশ ভালই ছিল। ১২ দিন পর বাচ্চাটির হৃদযন্ত্র আবার বন্ধ হয়ে গেল সেই একই জায়গায় রক্তক্ষরনের ফলে। আমরা ৪৫ মিনিটের মত আরেকটা কার্ডিয়াক মাসাজ করলাম কিন্তু এবারে আর কাজ হল না, হৃদপিন্ড চালু হলো না। আমি বাচ্চার মাকে জানালাম যে, আর কোন আশা নেই। তখন সে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ! হে আল্লাহ, যদি ওর সুস্থতায় কোন মঙ্গল থেকে থাকে তবে ওকে সুস্থ করে দাও, হে আমার প্রভু!”
আল্লাহর অশেষ রহমতে একটু পরে বাচ্চার হৃদপিন্ড আবার সচল হলো। একজন অভিজ্ঞ ট্রাকিয়া বিশেষজ্ঞ রক্তক্ষরন বন্ধ করতে সক্ষম হওয়ার পর হৃদপিন্ডের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা পর্যন্ত এই ছেলেটি আরো ৬ বার এরকম হৃদপিন্ডের অচলাবস্থার স্বীকার হয়েছিল। ইতোমধ্যে সাড়ে তিন মাসের মত হয়ে গেছে এবং বাচ্চাটি সুস্থ হচ্ছিল বটে কিন্তু চলাফেরা করতে পারছিল না। তারপর যখনই সে একটু  করে চলতে আরম্ভ করলো, এর চাইতেও অদ্ভুত এবং বিরাট আরেক মস্তিষ্কের সমস্যা দেখা দিল তার, যা আমি কখনও এর আগে দেখি নি। আমি তার মাকে এই মারাত্নক ঝামেলার কথা জানালাম এবং তিনি কেবল বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ!” এবং চলে গেলেন।

আমরা অনতিবিলম্বে বাচ্চাটিকে অন্য একটি সার্জিকাল ইউনিটের হাতে তুলে দিলাম যারা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে কাজ করে এবং তারা বাচ্চাটির চিকিৎসা চালিয়ে যেতে লাগলো। তিন সপ্তাহ পর বাচ্চাটি মস্তিষ্কের জটিলতা কাটিয়ে উঠলেও নড়াচড়া করতে পারছিল না। আরো দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেল এবং এখন অদ্ভুত এক রক্তদুষনের স্বীকার হলো এবং শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ৪১.২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে (১০৬ ডিগ্রী ফারেনহাইট) উঠলো। আমি পুনরায় বাচ্চার মাকে এই ভীষন নাজুক পরিস্থিতির বিষয়ে অবহিত করলাম এবং তিনি বরাবরে মতনই ধৈর্য্য ও দৃঢতার সাথে বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ! হে আল্লাহ, যদি ওর সুস্থতায় কোন মঙ্গল থেকে থাকে, তবে ওকে সুস্থ করে দাও।”
৫ নং বেডের বাচ্চার পাশে বসে থাকা এই মায়ের সাথে কথা শেষে আমি গেলাম ৬ নং বেডের আরেক শিশুর কাছে। এই শিশুটির মা কাঁদছিল এবং চিৎকার করছিল, “ডাক্তার! ডাক্তার! কিছু একটা করেন। আমার ছেলের শরীরের তাপমাত্রা ৩৭.৬ ডিগ্রী সেঃ (৯৯.৬৮ ডিগ্রী ফাঃ) সে মারা যাচ্ছে! সে মারা যাচ্ছে!” আমি অবাক হয়ে বললাম, “ঐ ৫ নম্বর বেডের মায়ের দিকে তাকান। তার সন্তানের ৪১ ডিগ্রী সেঃ (১০৬ ডিগ্রী ফাঃ) এর ওপরে জ্বর। এরপরেও উনি শান্ত রয়েছেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করছেন।” সে বললো, “ঐ মহিলার কোন বোধশক্তি নেই এবং কি হচ্ছে সে বিষয়ে কোন জ্ঞান নেই।” ঠিক এই মুহুর্তে আমার মনে পড়ে গেল রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর একটা হাদিসের কথা … “আগন্তুকদের জন্য সুসংবাদ!” কেবল দুইটি শব্দ … কিন্তু এই শব্দ দুটো নিঃসন্দেহে একটা পুরো জাতিকে আলোড়িত করবার ক্ষমতা রাখে। আমার দীর্ঘ ২৩ বছরের চিকিৎসা জগতের জীবনে এই  বোনটির মত ধৈর্য্যশীল আর কাউকে দেখি নি।
আমরা বাচ্চাটির যত্ন চালিয়ে যেতে লাগলাম এবং ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় মাস কেটে গেছে এবং বাচ্চাটি অবশেষে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বেরিয়েছে রিকভারি ইউনিট থেকে। হাটতে পারে না, দেখতে পায় না, শুনতে পাচ্ছে না, নড়তে পারছে না, হাসছে না … এবং এমন নগ্ন বুক নিয়ে বেরিয়ে এসেছে যেন হৃদপিন্ডের স্পন্দনগুলো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। শিশুটির মা নিয়মিত পোশাক পরিবর্তন করানো ইত্যাদি চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং ধৈর্য্যশীল থাকলেন আর ছিলেন আশাবাদী।  আপনারা কি জানেন পরবর্তীতে এর কি হয়েছিল? আপনাদেরকে সে বিষয়ে বলবার আগে বলুন, এই শিশুটির সম্পর্কে আপনারা কি ধারনা করেন যে কিনা এত এত কঠিন রোগ-শোক, বিপদের মুখোমুখি  হয়ে এসেছে? এবং এই মৃত্যুপথযাত্রী শিশুর সহনশীল মায়ের কাছে আপনারা কি আশা করেন যার কেবল মাত্রা আল্লাহতা’আলার কাছে দু’আ আর সাহা্য্যের প্রত্যাশা করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না? আপনারা জানেন আড়াই বছর পর কি হয়েছিল? এই শিশুটি সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করে ছিল আল্লাহতা’আলার অশেষ রহমত এবং এই পরহেযগার মায়ের পুরষ্কার হিসেবে। সে এখন তার মায়ের সাথে দৌড়ে বেড়ায় যেন কোন দিনই তার কিছুই হয় নি এবং সে সুঠাম স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠেছে যেমনটি আগেও ছিল।

গল্প এখানেই শেষ নয়। এটা সে জিনিস নয় যা আমাকে আলোড়িত করেছিল এবং আমার চোখে পানি নিয়ে এসেছিল। যে জিনিসটি আমায় কাদিয়েছিল তা হচ্ছে,
বাচ্চাটি হাসপাতাল থেকে বের হবার প্রায় বছর দেড়েক পর অপারেশন ইউনিটের একজন আমাকে জানালো যে একলোক, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি তাদের পরিচয় জানতে চাইলে সে বলল সে চেনে না। তো আমি তাদের দেখার জন্য গেলাম এবং দেখলাম এরা সেই ছেলেটির মা-বাবা আমি যার চিকিৎসা করেছিলাম। ছেলেটির তখন পাঁচ বছর এবং একটি ফুটফুটে ফুলের মতন স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠেছে এরই মাঝে যেন তার কখনই কিছু হয় নি। তাদের কোলে চার মাস বয়সী আরেকটি ছোট বাচ্চা ছিল সেদিন। আমি তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালাম এবং কৌতুক করে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম এই কোলের বাচ্চাটি কি তাদের ১৩ তম নাকি ১৪ তম সন্তান। তিনি আমার দিকে চমৎকার এক হাসির সাথে তাকালেন যেন আমার জন্য তার করুণা হচ্ছে। তিনি বললেন, “সদ্য ভূমিষ্ট এই শিশুটি আমাদের দ্বিতীয় সন্তান, আর আপনি যার চিকিৎসা করেছিলেন সে ছিল আমাদের প্রথম সন্তান যাকে আমরা পেয়েছিলাম ১৭ বছরের অনুর্বরতার পর। এই শিশুটিকে পাবার পর, সে এমন সব বিপদের সম্মুখীন হয়েছে যা আপনি নিজেই দেখেছেন।“

একথা শুনে, আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না এবং এরই মাঝে আমার চোখ দুটো কান্নায় ভিজে উঠেছে। আমি তারপর হালকাভাবে লোকটির হাত ধরে টেনে আমার রুমে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তার স্ত্রীর সম্পর্কে। “কে আপনার এই স্ত্রী যিনি ১৭ বছরের বন্ধাত্বের পর পাওয়া পুত্রের এত মারাত্নক সব বিপর্যয়ের মূহুর্তগুলোতেও প্রচন্ড ধৈর্য্যের সাথে মোকাবিলা করেছেন? তার অন্তর বন্ধা হতে পারে না। অবশ্যই সেটা বিশাল ইমানের দ্বারা উর্বর।” আপনারা জানেন তিনি কি উত্তর করেছিলেন? ভালো করে শুনে রাখুন হে আমার প্রানপ্রিয় ভাই ও বোনেরা। তিনি বলেছিলেন, “আমার সাথে এই মহিলার বিয়ে হয়েছিল ১৯ বছর ধরে এবং এই দীর্ঘ সময়ে আমি কখনও তাকে কোন সংগত কারন ছাড়া তাহাজ্জুদ সালাত ছেড়ে দিতে দেখি নি। আমি দেখিনি তাকে কখনও পরনিন্দা করতে, অযথা গল্প-গুজবে মত্ত হতে কিংবা মিথ্যা বলতে। যখনই আমি বাড়ি থেকে বের হয় বা ফিরে আসি সে নিজে দরজা খুলে দেয়, আমার জন্য দু’আ কর এবং আমাকে আপ্যায়ন করে। এবং সে যা কিছু করে সে সর্বোচ্চ ভালবাসা, যত্ন, সৌজন্য এবং মমত্বের পরিচয় রাখে।” লোকটি শেষ করলো এভাবে, “নিশ্চয়ই, ডাক্তার সাহেব, সে যে সমস্ত আদর্শ আচরন ও মমত্ববোধের সাথে আমার সাথে আচরন করে, আমি এমনকি তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাতেও লজ্জাবোধ করি।” তাই আমি তাকে বললাম, “সত্যিই। ঠিক এমনটিই সে আপনার কাছ থেকে প্রাপ্য।”

এখানেই শেষ।

উবুন্টু ১০.০৪ ( ল্যুসিড লিংক্স )এ বহুভাষী কোরআন সফটওয়্যার Zekr.


উবুন্টু ১০.০৪ তে একটি বিশাল পরিবর্তন আনা হয়েছে উবুন্টু সফটওয়্যার সেন্টারে। অনেক নতুন সফটওয়্যার যোগ করা হয়েছে এতে।
আজ হঠাত্ করেই সফটওয়্যার সেন্টারে সার্চ দিলাম quran লিখে, দেখলাম Zekr সফটওয়্যারটি এড করা হয়েছে। যে সফটওয়্যারটি আমি উবুন্টু ৯.০৪ তে অনেক চেষ্টা করেও ডাউনলোড করতে পারিনি। আর উবুন্টু ১০.০৪ থেকে খুব সহজেই ডাউনলোড করে নিলাম ও পাশাপাশি এড করে নিলাম বাংলা ও ইতালিয়ান অনুবাদ।
কেউ যদি ডাউনলোড করতে চান তাহলে…
ডাউনলোড :
Applacations – Ubuntu Software Center তারপর সার্চ বক্সে লিখুন quran
undefined
ইনস্টল করুন এই সফটওয়্যার দুটি, ব্যস হয়ে গেল ডাউনলোড।
এখন সফটওয়্যারটি পাবেন : Applacatins – Islamic Software – Zekr


undefined


বাংলা অনুবাদ এড
আলহামদুলিল্লাহ, মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের কোরআনের বাংলা অনুবাদটি এই সফটওয়্যারের সাথে ব্যবহার করা যাবে।

এখান থেকে ডাউনলোড করুন বাংলা অনুবাদের জিপ ফাইলটি। সফটওয়্যারটি ওপেন করে তারপর Tools – Add- Translation গিয়ে বাংলা অনুবাদটি এড করুন।
আরবীর সাথে বাংলা অনুবাদকে ডিফন্ট করে রাখতে চাইলে View – Tranlation [bn_BD] মাওলানা মুহিউদ্দিন খান সিলেক্ট করুন।

কেউ যদি ইংরেজী অনুবাদটি ও আরবীর পাশাপাশি রাখতে চান তাহলে এখান থেকে ডাউনলোড করুন ইংরেজী অনুবাদের ফাইলটি।
আরবী বাংলা ও ইংরেজী ভাষা এক সাথে দেখতে চাইলে :
View – Tranlation- Configure Custom Tranlations এ গিয়ে Abdullah Yusufali – en_US ও মাওলানা মুহিউদ্দিন খান – bn_BD এড করুন।


undefined

বাংলা লেখা ছোট দেখালে : Tools – Options- View তে গিয়ে trans_fa_fontSize এর 11 কে 13 অথবা 14 করে দিন। তাহলেই বাংলা লেখা সুন্দর দেখতে পাবেন।
বি.দ্র : সফটওয়্যারটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ও সফটওয়্যারটি উইন্ডোজের ডাউনলোড ও কনফিগারেশন এর নিয়ম কানুন দেখতে এখানে ক্লিক করুন।

ওয়ার্ডপ্রেস টিউটোরিয়াল-ছয়ঃ এডমিন প্যানেল পরিচিতি!

ওয়ার্ডপ্রেস এর আজকের টিউটোরিয়ালে স্বাগতম। গত পর্বগুলোতে আলোচনা ছিল ওয়ার্ডপ্রেসের শুরু থেকে কিভাবে আপনার লোকাল পিসিতে, রিমোট ওয়েব সার্ভারে ওয়ার্ডপ্রেস ইন্সটল করবেন সেগুলোর চিত্রভিত্তিক ধারাবাহিক বর্ণনা। আশা করছি এত দিনে সেগুলো ভালভাবে রপ্ত করছেন। আজ থেকে শুরু হবে ওয়ার্ডপ্রেসের ড্যাশবোর্ডের/এডমিন প্যানেলের বিস্তারিত আলোচ
নাসহ আরও অনেক কিছুই। নতুন সেই ধারাবাহিকতায় আজকের আলোচনার বিষয় “ওয়ার্ডপ্রেসএডমিন প্যানেল পরিচিতি”। তো চলুন শুরু করি… ১. প্রথমেই আপনার ওয়ার্ডপ্রেস সাইটে লগিন করুন। আপনার ওয়ার্ডপ্রেস সাইটের লগিন পেজ ঠিকানা হবেঃ yoursitename.extesion/wp-login.php ২. লগিন এর পরে যে পেজটি পাবেন তা নিচের মতো… এটিই হল বাই ডিফল্ট ওয়ার্ডপ্রেস সাইট বা ব্লগের ড্যাশবোর্ড প্যানেল। এবার আসুন ধাপে ধাপে ড্যাশবোর্ড এর প্রতিটি সেকশনের সাথে পরিচিত হইঃ ৩. Dashboard: ওয়ার্ডপ্রেস সাইটে লগিন করেই আপনি যে পেজটি পাবেন সেটিকে ড্যাশবোর্ড বলে। এই সেকশনে আপনি যা যা পাচ্ছেনঃ ক) Home: এই সেকশনের আওতায় আপনি আপনার সাইটে লগিন করেই যে পেজটি পাবেন তা নিচে দেখানো ড্যাশবোর্ড সেকশনের Home এ ক্লিক করেই আসতে পারবেন ড্যাশবর্ডের যেকোনো সেকশন থেকে। খ) Updates: এই মেন্যু থেকে আপনি আপনার ওয়ার্ডপ্রেস সাইটে আপনার ইন্সটল করা যেকোনো প্লাগিং, থীম এবং ওয়ার্ডপ্রেস সিএমএস-টির নতুন কোন ভার্সন বের হলে তা জানতে এবং এই পেজ থেকে সরাসরি আপডেট করে নিতে পারবেন। ৪ Posts: ওয়ার্ডপ্রেস সাইটে নতুন কোন লিখা দেওয়াকে পোস্ট বলে। এই সেকশনে আপনি যা [...]

হেডারে লোগো আপলোড করা ও ব্যানার অ্যাড উইজেট তৈরি করাঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-১২

সবাইকে সালাম ও শুভেচ্ছা জানিয়ে থিসিস থিম নিয়ে ১২তম পোস্ট আরম্ভ করতেছি। থিসিস থিম নিয়ে আমার আগের পোস্ট সমূহ দেখে নিতে পারেন- লেআউট ও কলামঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-এক নেভিগেশন মেনুঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-দু্ই নেভিগেশন মেনুঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-তিন সাইডবার ও উইজেটঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-চার ফুটারে তিনটি কলাম তৈরীঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-পাঁচ ফুটারে কলাম তৈরীঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-ছয় ফুটারে বিভাগ যুক্ত করাঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-সাত ব্যাকগ্রাউন্ড ইমেজ ও ফুটারে অ্যাড উইজেট যোগ করাঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-আট পোস্টে লেখক তথ্য যোগ করাঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-নয় পোস্টে একই রকম পোষ্টের তথ্য যোগ করাঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-দশ কনটেন্টে পোস্ট স্লাইডার যুক্ত করাঃ ওয়ার্ডপ্রেস থিসিস থিম টিউটোরিয়াল পর্ব-এগার গত পর্বে আমি আপনাদের দেখিয়েছিলাম কেমন করে কন্টেন্টে পোস্ট স্লাইডার বসানো যাই।আজকে আমি আপনাদের দেখাব হেডারে কেমন করে লোগো বসানো যাই এবং হেডারে অ্যাড উইজেট যুক্ত করা যাই। হেডারে লোগো বসানো প্রথমে আপনার হেডারের লোগো নির্বাচন করুন। আপনার ওয়ার্ডপ্রেস ব্লগে

সিএসই শিক্ষার্থীদের সি প্রোগ্রামিং ল্যাব সল্যুশন- প্রোগ্রামঃ-১

কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল-সিএসই, চরম একটা সাবজেক্ট, যদি আপনি প্রোগ্রামিংটা ভাল বুঝতে পারেন। কিন্তু দুঃক্ষের বিষয় হল বেশিরভাগ সিএসই শিক্ষার্থী প্রোগ্রামিংকে ভয় পায়। কারণটা আমার জানা নাই। এই ভয়ের মাত্রা এতোই বেশি যে আমার ৯০% সহপাঠী ফাংশন ব্যবহার করে যোগের প্রোগ্রাম লিখতে পারে না, যেখানে আমাদের এখন ৩য় সেমিস্টার চলছে। তবে প্রোগ্রামিং আমার কাছে সহজই লাগে। তাই আমি আমার প্রোগ্রামিং অভিজ্ঞতা সবার সাথে “সহজ” ভাবে শেয়ার করতে চলে আসলাম। আমি এখানে সিএসই ১ম সেমিস্টারে সি প্রোগ্রামিং ল্যাব এ যে প্রোগ্রামগুলো করানো হয় সেগুলো নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করব। পর্যায়ক্রমে অন্য সেমিস্টারের প্রোগ্রামগুলো নিয়েও আলোচনা হবে ইনশাল্লাহ। আমি এখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুসরন করব। তবে যদি কোন প্রোগ্রাম বাদ পরে যায় আপনারা মন্তব্যের মাধ্যমে জানাবেন, আমি সেগুলো নিয়ে আলোচনা করার চেস্টা করব। শুরু করা যাক। আজকে আমরা ১ টি সহজ প্রযোগ্রাম নিয়ে আলোচনা করব, প্রোগ্রামঃ-১ Question: Write a program to find the area of a circle. (Use π as a symbolic constant). প্রশ্নঃ বৃত্তের ক্ষেত্রফল বের করার জন্য একটি দি প্রোগ্রাম লিখুন।( π এর মান সিম্বোলিক কন্সট্যান্ট হিসাবে ব্যবহার করতে হবে )

পেশা হিসেবে আউটসোর্সিং: ঘরে ফেরার এক বছর

বহুদিন আগে মানচুমাহারা কোথাও লিখেছিলেন- “অন্যের অধীনে চাকরী করার চাইতে নিজেকে একজন উদ্যোক্তা ভাবতেই পছন্দ করি।” এই কথাটাই কিভাবে কিভাবে ইন্সপায়ারেশন হয়ে দাড়িয়েছিল খেয়াল করিনি। যদিও তখন তাঁর সাথে ব্যক্তিগত কোন পরিচয় ছিল না। তিনি আমার ফেইসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে ছিলেন এবং পেশায় একজন ফ্রিল্যান্সার এতটুকুই জানতাম। তবে আমিও যে ক্রমশ চাকরীজীবীর বদলে উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম এটা টের পেলাম অনেক পরে। যদিও আউটসোর্সিংয়ের বিষয়টা নিয়ে কখনোই তেমন কিছু ভাবিনি। তখন ভাবতাম একটা প্রতিষ্ঠান করার কথা। কিছু গ্রাফিক ডিজাইনার নিয়ে একটা ডিজাইন হাউজ করার ইচ্ছা ছিল লোকাল কাজগুলো করার জন্য। কিন্তু প্রথমত তখন একটা মাঝারি মানের প্রতিষ্ঠান করার মত পর্যাপ্ত টাকাও আমার ছিল না। একসময় এটার চাইতে আউটসোর্সিং অনেক সুবিধাজনক মনে হলো এবং সফল হতে পারলে নিজের এবং দেশের উভয়ের জন্যই লাভজনকও বটে। আর এর জন্য তেমন কোন পুঁজিরও দরকার নেই। আমার নিজের কাজের উপরে ৯ বছরের বেশী সময়ের অভিজ্ঞতা, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট কানেকশন সবই আমার ছিল। যদিও কম্পিউটারটা ছিল অনেক দুর্বল, এবং গ্রামীনফোনের স্লো ইন্টারনেট। তারপরও কাজ চালানো যায়। এখন প্রয়োজন সুযোগ এবং কিছুটা সময়।

যেভাবে শুরু:

প্রিন্টিং প্রেসে চাকরী করতাম। কাজের ফাঁকে অফিসে বসে এবং অফিস শেষে মেসে ফিরে বিভিন্ন ব্লগ ফোরামে আউটসোর্সিং বিষয়ে পড়াশুনা করেই কাটিয়ে দিতাম এবং একসময় মনে হলো এবারে একটু চেষ্টা করে দেখা যায়।
ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিলাম ওডেস্ক থেকে। আমার ভাগ্যটা ভালই বলতে হবে, প্রথম বিডেই কাজ পেয়ে যাই এবং সেটা শেষ করতে না করতেই আরো কয়েকটা কাজ পেয়ে যাই। ফলে সাহস আরো একটু বেড়ে গিয়েছিল। এছাড়া ওডেস্কে যাদের কাজ করেছি তারা তাদের পরিচিত বা বন্ধুদেরকেও আমার রেফারেন্স দিতে লাগলো কাজের জন্য। মনে হলো এর পেছনে যদি ফুলটাইম সময় দেয়া যায় তাহলে আমার পক্ষেও সম্ভব। এই অল্প বয়সে জীবনে অনেকগুলো চাকরী করেছি এবং ছেড়েছি তাই বর্তমান প্রেসের চাকরীটা ছাড়ার কথা ভাবতে খারাপ লাগেনি। যদিও প্রথম দিকে একটু আশঙ্কায় ছিলাম আসলে এই পেশাটিতে আদৌ টিকে থাকতে পারবো কিনা বা কিছুদিন পর সব বাদ দিয়ে আবার চাকরী খুজতে বেরোতে হয় কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি কেননা ৫ সদস্যবিশিষ্ট পুরো পরিবারটিই আমার উপরে নির্ভরশীল এবং আমার এমন কোন পুঁজি বা অন্য কোন আয়ের উৎস ছিল না যা দিয়ে আমার আয় বন্ধ থাকলেও দু’মাস চলতে পারবো। আমার এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার লোকেরও খুব বেশী কমতি হয়নি। তবে সাহস জোগানোর মত কিছু সত্যিকারের বন্ধুও যে ছিল না তা নয়। ফলে স্বাধীনতা এবং পরিবারের কাছাকাছি থাকার ইচ্ছেটাকে কোনমতেই দমানো গেল না।

সিদ্ধান্ত এবং তার বাস্তবায়ন:

ফলে গত বছরের ৩০ এপ্রিল চাকরী ছেড়ে সারারাতের ট্রেন ভ্রমণ শেষে ১লা মে সকালে বাড়ি পৌছেছিলাম এবং ১ বছর বাড়িতে বসেই কাজ করলাম। বলতে পারি আগের থেকে অনেক ভাল আছি।
যদিও প্রথমদিকে খুবই অসুবিধা হচ্ছিল ইন্টারনেট, বিদ্যুত, সামাজিক, পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়ে। আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় আউটসোর্সিংটা পেশা হিসেবে বিশেষ পরিচিত নয় এবং মফস্বল শহরগুলোতে কেউ যখন পেশা জিজ্ঞাসা করে তখন পেশাটিকে বুঝাতে ভালই বেগ পেতে হয়। এরপর ইন্টারনেট এবং বিদ্যুতের সমস্যা বুঝাতে গিয়ে আরো কিছু কিস্ট্রোক ব্যাবহার করার কারণ নেই। তবে বিদ্যুতের সমস্যা থেকে কিছুটা রেহাই পেতে ডেস্কটপের পরিবর্তে ল্যাপটপ ব্যবহার করছি। ইন্টারনেট কানেকশন হিসেবে ব্যবহার করছি বিটিসিএল এর ব্রডব্যান্ট কানেকশন। মাঝে মাঝে তার ছিড়ে যাওয়া ছাড়া এদের তেমন কোন সমস্যা নেই।

বর্তমান অবস্থা:

আমার ফ্রিল্যান্সিংয়ের শুরুটা ওডেস্ক থেকে। ওখান থেকেই কিছু ভালমানুষের সাথে পরিচয় হয়েছিল যারা আমার নতুন ক্যারিয়ারটা দাড় করানোর জন্য যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। দু’টো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সিনিয়র ডিজাইনার হিসেবেও কাজ করছি ১ বছরের বেশী হয়ে গেল। এছাড়া পুরোনো ক্লায়েন্টগুলোতো আছেই সেইসাথে পুরোনো ক্লায়েন্টগুলোর রেফারেন্সে আরো কিছু নির্ভরযোগ্য ক্লায়েন্ট পেয়েছি ওডেস্কে এবং ওডেস্কের বাইরে। ফলে কাজের অভাব হয়নি। যদিও বাংলাদেশে পেপাল না থাকায় অনেক নতুন ক্লায়েন্টের কাজই এখনো ছেড়ে দিতে হয়। শোনা যাচ্ছে, শীঘ্রই পেপাল বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম চালু করতে যাচ্ছে। তখন এ সমস্যা থাকবে না আশা করছি।
প্রথমদিকে একাই কাজ করতাম এবং সময়ের অভাবে অনেক কাজ ফিরিয়ে দিতাম। একসময় বুঝতে পারলাম আমি যা করছি তা ঠিক না। কেননা আমি যখন কোন ক্লায়েন্টকে ফিরিয়ে দিচ্ছি তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি অন্য আরেকজনকে খুজে নেবেন এবং তার ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে প্রতিষ্ঠান করার ব্যাপারটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। হ্যা, আমরা একটা প্রতিষ্ঠান করেছি তবে সেটাও ভার্চুয়াল। ঘড়ি ধরে কারো অফিসে আসার দরকার নেই। যে যার বাড়িতে বা ধানক্ষেতে বসে কাজ করুক তাতেও কোন আপত্তি নেই। সময়মত কাজ হলেই হলো। দেশে-বিদেশে সবমিলিয়ে ১২ জনের একটা টিম আমরা একে অপরের কাজে সহযোগিতা করছি। ব্যাপারটা মন্দ না।
পেশাটিকে আমি পছন্দ করছি তার প্রধান কারণ হিসেবে বলতো আমাকে কোথাও খুটি গেড়ে বসে থাকতে হয় না। কোথাও যেতে চাইলে ল্যাপটপটা ঘাড়ে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হলো। আমি যেখানে যাবো আমার অফিসেও সেখানে! আমি আমার পরিবারকে সময় দিতে পারছি, আমার বন্ধুদেরকে সময় দিতে পারছি আর কী চাই?
কৃতজ্ঞতা: মানচুমাহারা (যাকে এ পেশায় আসার পেছনে আমার আদর্শ মনে করি)

রবিবার, ১৭ জুন, ২০১২

কদম ও পাখিদের গল্প / জাফর তালুকদার | তারিখ: ১৫-০৬-২০১২


কথা ছিল পাঁচটায়, কিন্তু রাস্তাঘাটের যে অবস্থা, তাতে নিদেনপক্ষে ঘণ্টাটাক সময় হাতে নিয়ে না বেরোলে কথা রাখা যাবে না। রাস্তায় নেমে এতক্ষণে চিন্তাটা একটু গুছিয়ে নিতে পারল রুবিনা। আজকাল এ নিয়ে একটা ভালো রকম সমস্যায় পড়তে হয়। সবকিছু কেমন অদ্ভুত জট পাকানো। এই অসহায় আত্মসমর্পণের জন্য টুকটাক মাশুল গুনতে হয়। কখনো অপরাধী সাজতে হয় অন্যের কাছে। এই যেমন একটু আগেও রিকশার জন্য অপেক্ষা করে করে যখন ক্লান্তির হাই উঠছে, হঠাৎ সেই ভাবনাটা শুঁড় তুলে তাকে নিস্তেজ করে দিল আমূল। অর্থাৎ শান্তিনগরের বাড়িটা দেখতে এখন তার যাওয়া হচ্ছে না। যদিও বিজ্ঞাপনের যোগাযোগ সূত্রে একটা মানুষ র‌্যাংকিন স্ট্রিট থেকে এসে তার জন্য অপেক্ষা করবে ঠিক পাঁচটায়, সে-মতোই পাকাপাকি কথা হয়ে আছে। অথচ এক নিমেষেই সেটা উড়িয়ে দিয়ে তাকে নিরুপায়ে ফিরে যেতে হচ্ছে নিজের ঘরে! এবং এটাই স্বাভাবিক নিয়মে যখন এগোনোর কথা, হঠাৎ লোকজনের জঞ্জাল ফুঁড়ে একখানা রিকশা এসে আচম্বিতে দাঁড়ায় তার সামনে। কোনো বাক্য না করে অনেকটা যন্ত্রবৎ সে উঠে বসে চক্রযানটিতে। হোক না সে যতই উল্টো পথের পথিক—এই ইচ্ছে পূরণের বাহনটা ফিরিয়ে দেওয়ার শক্তি তার নেই।
ঘেমে-নাওয়া চটচটে রোদেল বিকেলটা পাড়ি দিয়ে সে যত এগিয়ে যায় সামনের দিকে, একধরনের বিরুদ্ধ বাতাস ধীরে ধীরে ফেঁপে ওঠে তার অস্থির পালে। মনে হয় ফিরে যাই। ফিরে যাই। পথে পথে এত ঠাসা লোকজন, ধোঁয়াধুলো আর গাড়িবহরের জ্যামে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এতক্ষণে হাওয়া মরে গিয়ে রোদটা তেতে উঠছে আরও। হরতালের আগের দিন বলেই লোকজন ঝাঁপিয়ে নেমেছে রাস্তায়। বাসগুলো ক্রুদ্ধ মোষের মতো ছুটছে। গোঙাচ্ছে। পিঁপড়ের সারির ভঙ্গিতে এগোচ্ছে নানাবর্ণ গাড়ির মিছিল। এমন হা-ভাতে দেশে এত গাড়ির রোশনাই আসে কোত্থেকে! নতুন নতুন দালান আর বাহারি সাজের দোকানপাট দেখেও কম ছানাবড়া হচ্ছে না চোখ। আসলে কত দিন হলো এদিকে আসা হয় না। সেই কবে এসেছিল তাও বলতে হবে হিসাব করে।
রুবিনা ছোট্ট রুমাল বের করে মুখখানা মুছল। ভেতরে ভেতরে ঘেমে নেয়ে উঠেছে একদম। কোথাও নেমে একটু গলা ভেজাতে পারলে হতো। এই ভুলটা সে একদম করে না। আজ করল। যেখানে যায় পানির বোতলটা তুলে নেয় আলগোছে। আজ একটু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বেমালুম ভুলে গেছে এই পুরোনো অভ্যাসটা।
মগবাজারের বিরক্তিকর জ্যামে ফেরিওয়ালার কাছে এক বোতল ঠান্ডা পানি পেয়ে তার মনে আনন্দের নহর বয়ে গেল। কেননা, এই মুহূর্তে তেষ্টা নিবারণ ছাড়া তার দ্বিতীয় কোনো স্বপ্ন ছিল না। বোতলে মৃদু চুমুক দিয়ে শান্ত মনে সে কী যেন খুঁজল রাস্তার ওপাশটায়। হ্যাঁ, ওখানেই তো ছিল চশমার দোকানটা। ওখানে একজন ডাক্তার বসতেন। খুব হাসিখুশি ছিলেন মানুষটা। প্রথম যখন চোখে সমস্যা হলো, সমস্যা মানে বেশিক্ষণ পড়াশোনা করলে চোখে পানি এসে যেত, সেই সঙ্গে একটু ঝাপসামতো লাগত সামনের জিনিসপত্র। প্রথমদিকে এটাকে সে আমলের মধ্যে আনেনি। একদিন কথায় কথায় মামুনকে জানাল ব্যাপারটা। মামুন সবকিছুতে উতলা হতে ভালোবাসেন। ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করে বলেই ওর ভেতর একটা ডাক্তারি ভাব আছে। বউ এ ধরনের একটা রোগ চেপে রেখেছে দেখে তার বোধ হয় একটু আঁতে লাগল। চায়ে বড় চুমুক দিয়ে সে লাফিয়ে উঠল, ‘কুইক, ডাক্তার কিবরিয়ার ওখানে চলো। চেনা লোক। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
ভয়ের কথা শুনে একটু হাসি পেলেও মুখে সেটা ফুটল না। তার ধারণা, ডাক্তারের কাছে চোখ নিয়ে গেলেই একটা চশমা ধরিয়ে দেবে। কেন যেন চশমায় তার বড় ভয়। মায়ের চশমাটা দু-একবার চোখে দিয়ে দেখেছে সকৌতুকে। তার চৌকো মুখখানা ঠিক দীপা ম্যাডামের মতো লাগে।
তখন তারা থাকে দিলু রোডে। ছোট্ট ছায়া ছায়া একটা ফ্ল্যাট। মাত্র দুখানা ঘর। পেছনে একচিলতে বারান্দা। ওই অতটুকু জায়গাতেই নানা রকম গাছ এনে পুঁতে দিয়েছে টবে। একটা আতা চারা দেখতে না দেখতেই লকলকিয়ে উঠল ডালপালায়। তার ছড়ানো ডাল একসময় গ্রিলের ফোকর পেরিয়ে মাথা উঁচাল আকাশের দিকে। প্রতিবার ফুল এলেও ফল ধরত না মোটেই। শুধু একবারই কী করে যেন টিকে ছিল একটা। সেই ফল নিয়ে যা মাতামাতি হয়েছিল ভাবতেও হাসি পায়। নেই নেই করে আরও কিছু ফুল আর বাহারি লতার গাছ খুব সাজ ধরেছিল সেই ছয়ছোট্ট বারান্দায়। একটা লালচে পাতার লতাকুমারী রাপুন-জেলের মতো লম্বা চুল খুলে দিয়েছিল নিচের বারান্দা অবধি। মিলু ভাবি হাসতে হাসতে বলতেন, ‘ভাগ্য একেই বলে, তুমি দাও পানি, আর আমি দেখি শোভা!’
শোভা কতটা ছিল কে জানে। তবে ওই একচিলতে বাগানের টানে ছোট্ট টুনটুনিদের দিনভর মেলা বসত সেখানে। সেই সাতসকালে এসে শুরু হয়ে যেত ওদের কলকাকলি। মামুন ছিল লেট-রাইজার। বালিশ মাথার ওপর চাপা দিয়ে সে বৃথাই ঠেকা দিত ওই খুশিতে মাতা খেলবাজ পাখিদের আওয়াজ। মুখে যতই বিরক্তির ভঙ্গি করুক, কেন যেন মনে হয় এই মুহূর্তটুকু ভেতরে ভেতরে ভারি উপভোগ করত মামুন। এই পোড়া শহরে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে, এটা নিয়ে একটা চাপা অহংকার ছিল তার। বাসিমুখে চায়ে চুমুক দিতে দিতে প্রতিদিন বারান্দায় এসে একটু দাঁড়াত মানুষটা। শব্দ পেয়ে পাখিগুলো ফুড়ুত করে উড়ে পালাত দিগ্ববিদিক। ওর মুখে এ সময় একটু ছায়া পড়ত। অপরাধীর মতো মুখ করে বলত, ‘শোনো রুবি, আমাদের যখন নিজেদের বাড়ি হবে, দুটো কদমের গাছ এনে লাগিয়ে দেব বারান্দা ছুঁয়ে। তখন ওদের আর খেলতে অসুবিধা হবে না।’
একটু বোধ হয় আনমনা হয়ে গেছিল রুবিনা। ঘড়ির কাঁটা ধরে সে মোড়টার কাছে চলে আসতে পেরেছে দেখে ভালো লাগল। কী যেন দোকানটার নাম—হ্যাঁ, মনে পড়েছে—ফুড হ্যাভেন। এটাই ছিল মিটিং-পয়েন্ট। অবশ্য কয়েকজন মানুষ অলস দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। দু-একজন আবার কথাবার্তা বলছে নিজেদের মধ্যে। মোবাইলে সেভ করা ছিল নম্বরটা। কল দিতেই মৃদু হাসির আওয়াজ ঝংকৃত হলো কানের কাছে, ‘আমি তো আপনার পেছনেই দাঁড়ানো। ফিরে দেখুন।’
মানুষটার রসিকতায় একটু লজ্জিত হলো রুবিনা। তাই তো, এদিকটা তো নজরে আসেনি।
তা ছাড়া, তাকে চিনবেই বা কী করে!
হাসিখুশি মানুষটা এবার সপ্রতিভ গলায় বলল, ‘ভাগ্যিস, আপনাকে দাঁড় করিয়ে রাখিনি। খুব লজ্জার হতো তাহলে।’
রুবিনা অপরিচিতের ধাক্কাটা সামলে উঠেছে ততক্ষণে, ‘আপনি অনেকক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছেন বুঝি!’
‘আপনি সে সুযোগ দিলেন কই। ভাবলাম, জ্যামের সুবাদে দশ-বিশটা মিনিট আপনার এদিক-ওদিক হতে পারে। এই সুযোগে একটু মুখাগ্নি করে নিই...।’
পথ সামান্যই। কয়েক পা এগিয়ে গলিটার ভেতর ঢুকেই প্রথম বাড়িটা সদ্য তৈরি, পুরো কাজ হয়নি, এখনো। নিচের দিকটা পুরোপুরি অসম্পূর্ণ। তবে ফ্ল্যাটে লোকজন উঠে গেছে, যে যার মতো। ডেভেলপারের তৈরি বাড়ি যেমনটা হয়। ফেলো কড়ি, লও চাবি। এই ভদ্রলোকেরও এত দিনে চাবি পকেটে নেওয়ার কথা। কিন্তু মাথায় ঢুকেছে, ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে যে এক তোড়া টাকা পাবে, সেটা কানাডার পেছনে খরচ করলে আখেরে কাজ হবে। বুদ্ধিমানেরা এভাবেই হয়তো ঢিল ছোড়ে। লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও পা অন্তত গর্তে পড়ে না।
সিঁড়ি ভেঙে চারতলায় উঠতে হবে শুনে একটু থমকে দাঁড়াল রুবিনা। সে কিছুদিন ধরে হাঁটু-সমস্যায় ভুগছে। এখন অবশ্য এটা আমলে আনার কোনো মানে হয় না। ভবিষ্যতে লিফটের ব্যবস্থা হবে এটাই সান্ত্বনা।
সিঁড়িটা ধুলোবালিতে মাখামাখি হলেও এদিকে চোখ দেওয়ার তেমন প্রয়োজন মনে হলো না। এগারো শ দশ বর্গফুটের যে ফ্ল্যাটটি সে দেখতে এসেছে, এটা কতটা পছন্দ হবে, সেটাই সারকথা।
চারতলার বাঁ হাতের দরজাটার সামনে এসে মানুষটা থামল। বেশ কারুকার্যময় নকশি দরজা। সুদৃশ্য ডোর-ভিউর সঙ্গে যুক্ত নেমপ্লেট। মূল্যবান বিদেশি লক, হ্যান্ডেল। হাতলে আলতো স্পর্শ বুলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল মানুষটার পেছন পেছন। শুরুতে চোখ আছড়ে পড়ল ঘরের মাঝখানে দাঁড়ানো একটা সাদা চৌকো পিলারের দিকে। পুরো পিলারটাই ধবধবে টাইলসে মোড়ানো। এতে সৌন্দর্য বাড়লেও স্থায়ী এই দণ্ডটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে স্পেস বণ্টনে। খাবার টেবিল কোথায় বসবে, এ নিয়ে গম্ভীর পরামর্শ চলল দুই তরফে। কিন্তু কোনো স্থায়ী সুরাহা হলো না। মনটা বেজার হয়ে থাকল।
তবে বাকি আয়োজনটুকু একেবারে ফেলে দেওয়ার নয়। সাকল্যে তিনটা বেডরুম। দুটোতেই অ্যাটাচ বাথ। বাকিটা কমন। দুটো বারান্দা অন্য বাড়ির মুখোমুখি হলেও মন্দ নয়। পশ্চিম কোণের ঘরটিতে যেতে হয় একটা ছোট্ট করিডর পেরিয়ে। ভেতরে এসে জানালা ছুঁয়ে দাঁড়াল রুবিনা। এখান থেকে বেশকিছু গাছপালা চোখে পড়ছে। সবচেয়ে অবাক হলো, একটা কদমগাছ দেখে। চমৎকার ডালপালা আর সবুজ পাতায় ভরে আছে গাছটা। কদিন পর ফুল এলে একেবারে স্বর্গ হয়ে যাবে দৃশ্যটা। আর কী আশ্চর্য, রাজ্যের টুনটুনি এখনই মেতেছে সেখানে অপূর্ব ফুর্তিতে। এই আনন্দের মাঝে পিলারের খচখচানিটা দূর হয়ে গেল।
মানুষটা পাশেই দাঁড়ানো ছিল। তার মুগ্ধতা লক্ষ করে এবার একটু মুখর হলো, ‘বাথরুমটা দেখেন। এর সব টাইলস কিন্তু এ গ্রেডের। রং আর ডিজাইনের কম্বিনেশনটা দেখেছেন? হাতিরপুলের দোকানে দোকানে ঘুরে আমার ওয়াইফ এসব পছন্দ করেছে। এখানে কোনো ফাঁকি পাবেন না...।’
‘হ্যাঁ, সেটা দেখেছি। ওনার রুচি আছে বটে।’
‘রান্নাঘরটাও ও মনের মতো সাজিয়ে নিয়েছে। ওখানের টাইলসের রংটা কিন্তু একটু অন্য রকম। লতাপাতার কাজটা দারুণ! এসব সাজাতে গিয়ে অনেক বাড়তি খরচ হয়ে গেছে। তবে শখের কাছে এটা কিছু না, কী বলেন?’ বক্তব্যের সমর্থনের আশায় সে তাকাল পার্শ্ববর্তিনীর দিকে।
রুবিনা তাকে নিরাশ করল না, ‘অবশ্যই। তবে এমন শখ করে সব বানিয়ে সেটা এখন ছেড়ে দিচ্ছেন কেন? সরি, যদিও এটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার।’
মানুষটা এবার সরাসরি তাকাল তার মুখের দিকে। চোখটা আশ্চর্য রকম নিষ্প্রভ। মুখখানা ফ্যাকাশে। ঠোঁট দুটো দু মুহূর্ত কেঁপে থির হলো। ভেতরের ঝোড়ো হাওয়াটা শান্ত হওয়ার পর একটু সময় নিয়ে সে স্বগতোক্তির মতো বিড়বিড়িয়ে বলল, ‘যার জন্য এত শখ করে এটা নিয়েছিলাম, সে যখন নেই, তখন আর এ দিয়ে কী হবে!’
‘কেন কী হয়েছে ওনার!’ রুবিনার কণ্ঠে বিস্ময় ঝরে পড়ে।
‘ক্যানসার...। বহু চেষ্টা করেও লাভ হলো না ভেলোরে কিছুদিন রেখে ডাক্তার ছেড়ে দিল। মাঝখান থেকে ঋণ হয়ে গেল গুচ্ছের টাকা। এখন এই ঋণ শোধ দিতেই ছেড়ে দিতে হচ্ছে ফ্ল্যাটটা...।’
রুবিনা এর উত্তরে কী বলবে ভেবে পেল না। সে জানালা গলিয়ে তাকিয়ে আছে কদমগাছটার দিকে। আর কদিন পরই বৃষ্টি এসে যাবে। তখন নিশ্চয় ফুলে ফুলে ছেয়ে যাবে গাছটা। এখানে দাঁড়িয়ে যে অপার সৌন্দর্য উপভোগ করার কথা ছিল মহিলার, আজ তাকে চলে যেতে হয়েছে অজানা রাজ্যের ঠিকানায়। এভাবে হয়তো স্বপ্নগুলো ফুল হয়ে ফোটে, আবার ঝরেও যায় নিয়তির টানে।
এ এক অনন্ত খেলা। এর রহস্য বোঝার শক্তি তার মতো ক্ষুদ্রের নেই।
রুবিনা বড় করে নিঃশ্বাস ফেলল।
‘এ রকম একটা গাছের ভারি শখ ছিল ওর। ডালপালায় ঘেরা ছোট একটা ব্যালকনি। আর কিছু পাখি। ঠিক সেই দিলু রোডের প্রথম দিনগুলোর মতো...।’
‘বেশ তো, ওনাকে নিয়ে এলেই হতো। সেই ব্যালকনি, কদম, পাখি সবই তো এখানে আছে, যেমনটা চাইছিলেন।’
রুবিনার কানে কথাটা গেল কি না বোঝা গেল না। তখন অন্ধকার নেমে গেছে। আকাশটা থমথমে। বাতাস বন্ধ হয়েছে অনেকক্ষণ। আজকাল হঠাৎ হঠাৎ কালবৈশাখীর তাণ্ডব শুরু হয়ে যায়। এখনই না ফিরলে হয়তো আটকে যেতে হবে পথে।
রুবিনা অন্ধকারের মধ্যে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে বুঝল মানুষটা উত্তরের প্রতীক্ষা করছে। কিন্তু এখন কোনো কথা বলার প্রবৃত্তিই তার নেই। তবুও ভদ্রতা বলে কথা। অস্ফুট স্বরে অনেক কষ্টে একটা কথাই বলতে পারল, ‘সে আর আসবে না।’
এরপর সেই আধো-আলোর প্রাচীর ভেঙে দুজন মানুষ অতি কষ্টে বেরিয়ে এল সেই জাদুকরি গুহার আগল খুলে।
এত সাবধানতার পরও সেই পিলারটায় মৃদু ধাক্কা খেল রুবিনা। মানুষটা সঙ্গে সঙ্গে হাত না বাড়ালে হয়তো আছড়েই পড়ত মেঝেতে।
‘সরি, একটু সাবধানে পা ফেলবেন। আলোটালো নেওয়া হয়নি। বাইরে বোধ হয় লোডশেডিং শুরু হয়েছে।’
‘আপনি চিন্তা করবেন না। আমি ঠিকই পারব।’
‘সিঁড়িতে কিন্তু রেলিং নেই। একটু দেয়াল ঘেঁষে নামবেন।’
‘আমাকে নিয়ে আপনার এত ভয় কেন? না-হয় আছড়ে পড়ে একটা পা-ই ভাঙবে। এর বেশি কিছু নয়তো!’
সিঁড়ির অনেকগুলো ধাপ এখনো বাকি। একটু সাবধানে পা না ফেলে উপায় নেই।
মোবাইলের আলো জ্বেলে এই অন্ধকারটুকু অনায়াসে দূর করা যায়। কিন্তু অনেক সহজ বুদ্ধিও অকারণই লোপ পায়। ঠিকঠাক মনে থাকে না।
মানুষটা এতক্ষণে একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে মুখের সামনে ধরল, ‘সে আসবে না কেন, বললেন না তো?’
‘ সুইসাইড করেছে।’
‘সুইসাইড! কেন?’
‘ও যে মহিলাকে গোপনে ভালোবাসত সে ক্যানসারে মারা যাওয়ার পর খুব আপসেট হয়ে যায়...।’
বাকি পথটুকু কেবলই সাড়াহীন। পা গুনে গুনে সিঁড়ি ভাঙা। নিজের শব্দে নিজেই চমকে ওঠা।
আলোর দেখা কখন মিলবে কে জানে!

বুধবার, ৬ জুন, ২০১২

স্বপ্ন আমার / আবুল বাশার শেখ


 অনেকগুলো স্বপ্ন
 জমা বুকের ভেতর,
 মানুষ ভাবি যাকে
 সে আসলে পাথর।

 বুঝেনা সে চোখের ভাষা
 বুঝেনা মনের কথা,
 আচরণে তার ক্ষনে ক্ষনে
 পাই যে আমি ব্যথা।

 মনের দুঃখ মনেই থাকে
 যায় না তো ভাগ করা,
 ভেবে দেখি বেঁচে থেকে
 এখন যে আমি মরা।

 যে দিন আমি হারিয়ে যাব
 না ফেরার ঐ দেশে,
 না চাইলেও দু’ফোটা অশ্রু
 ঝরবে চোখেতে শেষে।

শনিবার, ২৬ মে, ২০১২

তোমার রাঙা ঠোঁট // সফিউল্লাহ আনসারী


আমার আকাশ চন্দ্র গ্রহন
কষ্ট দারুন রাত
তোমারটাতে জোৎস্না প্লাবন
সুখের জল প্রপাত 

করছি বরন মরনটারে
নীল আকাশের তলে
বিষাদ সময় বহন করে
ভাসছি নয়ন জলে 

রাখছে ঘিরে আধাঁর কালো
সারাটা ন ধরে
প্রতিাতে সময় আমার
তোমার স্মৃতি স্বরে 

নষ্ট আমি কষ্ট পেয়ে
স্পষ্ট এখন সবি
তোমার দেয়া আঘাত আমায়
করলো বিষাদ কবি 

দিন কাটেতো যেমন তেমন
রাত কাটেনা মোটে
আজো আমি সুখটা খুঁিজ
তোমার রাঁঙা ঠোঁটে 

সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর মমত্ববোধের প্রিয় কবি তোমায় লাখো সালাম // ”মোঃ রফিকুল ইসলাম রফিক”


২৫মে,১১ জৈষ্ঠ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৩তম জন্মবার্ষিকী পালিত হল।দেশের বিভিন্ন স্থানে কবি’র জন্মবার্ষিকীকে ঘিরে ছিল নানা আয়োজন।ময়মনসিংহের ত্রিশালে কবির বাল্য ও কৈশোরের নানা স্মৃতি বিজরিত স্থান গুলোতেও চলছে বিভিন্ন আয়োজন।প্রতিবছর দরিরামপুর নজরুল মঞ্চে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান মালা আয়োজিত হলেও এবার হয়েছে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সে দিক দিয়ে নজরুল প্রেমীদের মাঝে একটা শুন্যতা বিরাজ করলেও নজরুলকে শ্রদ্ধা জানাতে ভুলে যায়নি এলাকার আবালবৃদ্ধবনিতা।চেষ্ঠা করেছেন নজরুলকে সকলের মাঝে যথাযথভাবে তুলে ধরতে।নজরুল আমাদের বিদ্রোহের কবি। তিনি কু-সংস্কার, অসুন্দর,অমানবিকতা,অবিচার,অসাম্য,শোষন,সংকীর্নতা,পরাধিনতা ও পশু শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন।সাম্য,স্বাধিনতা ও মাতৃত্ববোধে তিনি ছিলেন এক মূর্ত প্রতীক।নজরুল তাঁর সঙ্গীতে,কর্মজীবনে,কাব্যে অভেদ সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্ঠা করেছেন।নজরুল ছিলেন এক অলৌকিক প্রতিভার অধিকারী,আকাশের মত বিশাল ও উদার ক্ষনজন্মা পুরুষ।তাঁর আবির্ভাব ধুমকেতুর মতই তীব্র,বেগময় ও বর্নোচ্ছটাময়।তিনি বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি ও সঙ্গীতকার।নজরুলকে আমরা একক একটি নতুন সত্বা ও নতুন শক্তিরুপে দেখতে পেয়েছি।মাত্র ২২বছরের সাহিত্য সাধনায় কবি রেখে গেছেন বিশ্ব সাহিত্য ভান্ডারে অমুল্র সম্পদ।জাতির দুর্ভাগ্য যে মাত্র ৪২ বছর বয়সে এই অসামান্য প্রতিভার অধিকারী কবি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারান।সাহিত্যের বৈচিত্রতায় একাধারে তিনি কবি,উপন্যাসিক,প্রবন্ধকার,গল্পকার,অনুবাদক, অন্যদিকে তিনি একজন সফল চলচ্চিত্রকার,নাট্যকার,অভিনেতা,পরিচালক,গীতিকার,সুরকার ও নতুন নতুন রাগ রাগিনীর ¯্রষ্ঠাও।পাশাপাশি তিনি সাংবাদিক,রাজনীতিক ও সৈনিক ছিলেন।অলৈাকিক প্রতিভার অধিকারী এ কবি প্রতিকুলতাকে জয় করেই পৃথিবীতে আসেন।জন্মের পর থেকে নানা প্রতিকুল ও বৈরিতার ভিতর দিয়েই জাতির কাছে পৌঁঁছুতে সক্ষম হন।সংকীর্ন মহল শুরু থেকেই তার পিছু ছিল।তার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িতার ধুঁয়া তুলে সমালোচনা করা হয়েছে ভুষিত করা হয়েছে দেশদ্রোহীর খেতাবেও।একদিকে তাঁেক যেমন মৌলবাদী হিসেবে দেখানোর চেষ্ঠা করা হয়েছে অপর দিকে মোল্লা মুন্সীরাও ধর্মদ্রোহী আখ্যায়িত করতে দ্বিধা করেননি।নজরুলের সৃষ্ঠিশীল সাহিত্য ও সঙ্গীতে সার্বজনিন সকল সম্প্রদায়ের কথাই তুলে ধরা হয়েছে গভীর মমত্ববোধের সঙ্গে।তাই তিনি ছিলেন সার্বজনিন কবি।সুখের কথা হচ্ছে তিনি দু’পক্ষেরই তালি ও গালি পেয়ে  নিজের সার্বজনিন আসনকে পাকাপোক্ত করেছেন।নিজের স্বার্থ দেখার সুযোগ বা ফুরসৎ ছিলনা দারিদ্রতার অক্টোপাশে জড়িয়ে থাকা এ কবির।আজন্ম স্বাধিনতায় বিস্বাষী কবি সর্বদাই পাপ,পংকিলতা,জরাজির্নতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।নিশ্চল,স্থবির ও বিরাগী জীবন ধারায় নজরুল এক নবজীবন চেতনার নাম।তিনি বলেছিলেন অসাম্য ও ভেদ জ্ঞান দুর করতে আমি এসেছি।নজরুলের গান ও রচনাবলী সর্বদাই জাগ্রত করে মননশীলতাকে।একথা বলতে দ্বিধা নেই যে,বর্তমান সময়ের অসুস্থ মানষিকতা,বিকৃত রুচিবোধ অর্থ ও বর্নহীন সাহিত্য এবং সঙ্গীতে নজরুলের সৃষ্টি কর্মই একমাত্র অবলম্বন।যাকে আঁকড়ে ধরেই নতুন শতাব্দির নব প্রজন্মের নিকট বেঁচে থাকবে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভান্ডার।নজরুলের জীবনধারা ছিল বৈচিত্রতায় ভরপুর।তার সৃষ্টি কর্মের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন সঙ্গীতাঙ্গনকে নিয়ে। সঙ্গীত জগতে নজরুলের বিচরন ক্ষেত্রটি ছিল বিশাল।নজরুলের রচিত গানের সংখ্যা ৩হাজারের মতো।বিভিন্ন ধরন ও আঙ্গিকের গান তিনি রচনা করেছেন।নজরলের সমৃদ্ধ সঙ্গীতের ভুবনে প্রবেশ করলে অমরা পরিচিত হতে পারি রাগ প্রধান গান,গজল,কাব্য সঙ্গীত,প্রেমগীত,ঋতু সঙ্গীত,হাসির গান,খেযাল,কোরাস,গনসঙ্গীত,শ্রমিক-কৃষকের গান,শ্র্যমা সঙ্গীত,হিন্দি ,লোকধারার গান সহ আরো অনেক বৈচিত্রের গানের সঙ্গে।নজরুলের গানে বাংলা ছাড়াও উর্দু,ফারসি,হিন্দি ইত্যাদি ভাষার আগমন ঘটেছে।লোক সঙ্গীতে স্বদেশী সুর,বাউল,ভাটিয়ালী,ভাওয়াইয়া,ঝুমুর,লোকসুর,লোকগান,গনসঙ্গীত,মেয়েলি গীত,ছন্দ পেটানো গান,ইত্যাদির সংমিশ্রন রয়েছে।এ ছাড়াও নজরুলের বিখ্যাত লেটো গানতো আছেই।গ্রামীন জীবন ধারার কবি লেটো গান রচনা ও লেটো দলে যোগদান করে সাহিত্য জীবনের এক গুরুত্বপুর্ন অধ্যায় অতিক্রম করেছেন।মক্তবে শিক্ষকতা,মাজারে খাদেম,মসজিদে ইমামতি এমনকি গ্রামের মোল্লাগিরিও বাদ রাখেননি জীবনজিবীকার প্রয়োজনে।পারিবারিক অসচ্ছলতার কারনে লেটো দলে গান ও নাটক রচনা করেও তাকে অর্থ উপার্জন করতে হয়েছে।তখনকার সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তার লেটো গান ব্যাপক আলোড়ন তুলে এখনো অনেক এলাকায় এর প্রচলন বিদ্যমান।লেটো দলে তার কয়েকটি পালার মধ্যে রাজপুত্র,আকবর বাদশা,মেঘনাবদ কাব্য,আজব বিয়ে,চাষার সঙ ইতাদি।নজরুলের ঝুমুর আঙ্গিকে করা গানে প্রেমিকাকে প্রকৃতির সঙ্গে মিলানোর চেষ্ঠা করেছেন এ ভাবে ’এই রাঙ্গামাটির পথে লো মাদল বাজে বাজে বাঁেশর বাশী .....মন লাগেনা কাজে লো......রইতে নারী ঘরে ওলো প্রান হলো উদাসিলো...।তিনি লোক সঙ্গীতেও প্রকৃত সুরের দিকে গুরুত্ব দিতেন।বিদ্রোহী কবির ভিতর বাউলেরও যে বসবাস ছিল তার গান থেকেই তা স্পষ্ঠ হয়ে উঠে যেমন’মোরা ভাই বাউল চারন মানিনা শাষন বারন জীবন মরন মোদের অনুচররে.....।ভাটিয়ালী সুরে নজরুল লিখেছেন ”এ কুল ভাঙ্গে ও কুল  গড়ে এই তো নদীর খেলা” অথবা কোন বিদেশের নাইয়া তুমি আইলা আমার গাঁও...লিখেছেন ’ও নাইয়া ধীরে চালাও তরনী.....।নজরুলের ’কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙ্গে ফেল করলে লোপাট রক্ত জমাট শিকল পূজোর পাষান .........গানটি কেবল ঔপনিবেশিক শক্তি বিরোধী আন্দোলনেই না প্রেরনা যুগিয়েছে আমাদের মহান মুক্তযোদ্ধেও।অলোক প্রতিভার চির বিদ্রোহের এ কবি আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন প্রতিটি অন্যায় অত্যাচার ও জুলুম নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে।আসবেন অসাম্য জাতি ভেদ কুসংস্কারের বিরোদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ নিয়ে।কবি বেঁচে থাকবেন ’মম এক হাতে বাঁকা বাঁেশর বাঁশরী আর হাতে রন তুর্য’ নিয়ে আমাদের শোনাবেন শিকল ভাঙ্গার গান।১১৩তম জন্মবার্ষিকীতে কবি ভক্তদের এটাই প্রত্যাশা।বিন¤্র ভক্তি ও শ্রদ্ধা জানাই বাংলার গানে বুলবুলের এ আগমনী দিনে।তিনি বেঁচে থাকুন ’চির উন্নত মম শীর নিয়ে’ সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে।তিনি বলেছিলেন ’আমি চিরতরে দুরে চলে যাব তবু আমারে দেবনা ভুলিতে’আজকের ক্ষনটিতে নতুন প্রজন্মের একজন সংস্কৃতি কর্মী হিসেবে আমরা কবিকে জানাতে চাই,হে চির বিদ্রোহের কবি আমরা তোমায় ভুলিনি এবং ভুলবওনা।তুমি বেঁেচ আছো এবং থাকবে।যেখানেই শোষন,অত্যাচার,নির্যাতন,নিপিড়ন,অজ্ঞতা,কু-সংস্কার,অসাম্যতা,জাতি,ধর্ম,বর্ন ভেদ সেখানেই তোমার বানীই এখনো একমাত্র চেতনা ও প্রেরনার উৎস।বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্ভারের এ কালজয়ী পুরুষ তোমাকে’জাতীয় কবি’ হিসেবে পেয়ে আমরাও গর্বিত ও উৎফুল্লিত।সৃস্ট্রিকর্তার প্রতি গভীর মমত্ববোধের প্রিয় কবি তোমায় লাখো সালাম।  


লেখকঃ
কন্ঠ শিল্পী,
বাংলাদেশ বেতার,
শিক্ষক,সাংবাদিক
ও সাংস্কৃতিক সংগঠক
ভালুকা,ময়মনসিংহ।

শুক্রবার, ২৫ মে, ২০১২

দুখু মিয়া থেকে বিদ্রোহী নজরুল // এস,এম,আশিক


বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, দার্শনিক, যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকার সঙ্গে সঙ্গে প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ - দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।  ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ।
রুটির দোকানের  দুখু মিয়া
কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল “দুখু মিয়া”।অভাব অনটন ও কষ্টের জীবনযাপনের জন্য তার নাম রাখা হয় দুখু মিয়া। তিনি বাল্য বয়সে স্থানীয় মক্তবে ‘মসজিদ পরিচালিত মুসলিমদের ধর্মীয় স্কুলে ‘পড়াশুনা শুরু করেন। ১৯০৮ সালে তার বাবা মারা যায়। তখন তার বয়স মাত্র নয় বছর। পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তাঁর শিক্ষা বাধাগ্রস্থ হয়। মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁকে নেমে যেতে হয় রুটি-রুজির সন্ধানে। এসময় তিনি মক্তবে ছাত্র পড়ানো শুরু করেন। একই সাথে হাজী পালোয়ানের কবরের সেবক এবং মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসাবে যুক্ত থাকেন। এভাবে তিনি ইসলাম ধর্মের মৌলিক বিষয়ের সাথে পরিচিত হন। মক্তব, মসজিদ ও মাজারের কাজে তিনি বেশি দিন ছিলেন না।বাল্য বয়সেই তিনি লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। একটি লেটো দলে যোগ দেন। তার চাচা কাজী ফজলে করিম চুরুলিয়া অঞ্চলের লেটো দলের ওস্তাদ ছিলেন। আরবি, ফারসি ও উর্দূ ভাষায় তার দখল ছিল।  ১৯১০ সালে নজরুল লেটো দল ছেড়ে ছাত্র জীবনে ফিরে আসেন। তিনি প্রথমে রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি হন। আর্থিক সমস্যার কারণে বেশী দিন পড়াশোনা করতে পারেন নি। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর তাকে আবার রুটি-রুজির সন্ধানে যেতে হয়। প্রথমে যোগ দেন বাসুদেবের কবি দলে। একজন খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা এবং সবশেষে আসানসোলের চা-রুটির দোকানে রুটি বানানোর কাজ নেন।
সৈনিক নজরুল
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশেরনওশেরায় যান। প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন কাটাতে শুরু করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগ থেকে ১৯২০খ্রিস্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় আড়াই বছর। এই সময়ের মধ্যে তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদারপর্যন্ত হয়েছিলেন। উক্ত রেজিমেন্টের পাঞ্জাবী মৌলবির কাছে তিনি ফারসি ভাষা শিখেন। এছাড়া সহসৈনিকদের সাথে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সঙ্গীতের চর্চা অব্যাহত রাখেন, আর গদ্য-পদ্যের চর্চাও চলতে থাকে একই সাথে। করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল যে রচনাগুলো সম্পন্ন করেন তার মধ্যে রয়েছে, বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী (প্রথম গদ্য রচনা), মুক্তি (প্রথম প্রকাশিত কবিতা); গল্প: হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে, কবিতা সমাধিইত্যাদি। এই করাচি সেনানিবাসে থাকা সত্ত্বেও তিনি কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী,মর্ম্মবাণী, সবুজপত্র, সওগাত এবং বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা। এই সময় তার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ফারসি কবি হাফিজেরকিছু বই ছিল। এ সূত্রে বলা যায় নজরুলের সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি এই করাচি সেনানিবাসেই। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাবার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় আর যাননি। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। এর পর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।
সাংবাদিক নজরুল
যুদ্ধ শেষে কলকাতায় এসে নজরুল ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। তার সাথে থাকতেন এই সমিতির অন্যতম কর্মকর্তা মুজফ্ফর আহমদ। এখান থেকেই তার সাহিত্য-সাংবাদিকতা জীবনের মূল কাজগুলো শুরু হয়। প্রথম দিকেই মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তার কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস বাঁধন হারা এবং কবিতা বোধন, শাত-ইল-আরব, বাদল প্রাতের শরাব, আগমনী, খেয়া-পারের তরণী, কোরবানি, মোহরর্ম, ফাতেহা-ই-দোয়াজ্‌দম্। এই লেখাগুলো সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এর প্রেক্ষিতে কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত পত্রিকায় তার খেয়া-পারের তরণী এবং বাদল প্রাতের শরাব কবিতা দুটির প্রশংসা করে একটি সমালোচনা প্রবন্ধ লিখেন। এ থেকেই দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমালোচকদের সাথে নজরুলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় শুরু হয়। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে কাজী মোতাহার হোসেন, মোজাম্মেল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আফজালুল হক প্রমুখের সাথে পরিচয় হয়। তৎকালীন কলকাতার দুটি জনপ্রিয় সাহিত্যিক আসর গজেনদার আড্ডা এবং ভারতীয় আড্ডায় অংশগ্রহণের সুবাদে পরিচিত হন অতুলপ্রসাদ সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, শিশির ভাদুড়ী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মেলন্দু লাহিড়ী, ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ করমতুল্লা খাঁ প্রমুখের সাথে। ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শান্তিনিকেতনে যেয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। কাজী মোতাহার হোসেনের সাথে নজরুলের বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।১৯২০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই ১২ তারিখে নবযুগ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া শুরু করে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনেরপ্রেক্ষাপটে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। এই পত্রিকার মাধ্যমেই নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ঐ বছরই এই পত্রিকায় “মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে?” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন যার জন্য পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং নজরুলের উপর পুলিশের নজরদারী শুরু হয়। যাই হোক সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। একইসাথে মুজফ্‌ফর আহমদের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতি বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন। বিভিন্ন ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কবিতা ও সঙ্গীতের চর্চাও চলছিল একাধারে। তখনও তিনি নিজে গান লিখে সুর দিতে শুরু করেননি। তবে ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গীতজ্ঞ মোহিনী সেনগুপ্তা তার কয়েকটি কবিতায় সুর দিয়ে স্বরলিপিসহ পত্রিকায় প্রকাশ করছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে: হয়তো তোমার পাব দেখা, ওরে এ কোন স্নেহ-সুরধুনী। সওগাত পত্রিকার ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায় তার প্রথম গান প্রকাশিত হয়। গানটি ছিল: “বাজাও প্রভু বাজাও ঘন”
সাহিত্যকর্মে নজরুল
নজরুলের কবিতা১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পথে নজরুল দুটি বৈপ্লবিক সাহিত্যকর্মের জন্ম দেন। এই দুটি হচ্ছে বিদ্রোহী কবিতা ও ভাঙ্গার গান সঙ্গীত। এগুলো বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। বিদ্রোহী কবিতার জন্য নজরুল সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। একই সময় রচিত আরেকটি বিখ্যাত কবিতা হচ্ছে কামাল পাশা। এতে ভারতীয় মুসলিমদের খিলাফত আন্দোলনের অসারতা সম্বন্ধে নজরুলে দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯২২ সালে তার বিখ্যাত কবিতা-সংকলন অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় একটি নতুনত্ব সৃষ্টিতে সমর্থ হয়, এর মাধ্যমেই বাংলা কাব্যের জগতে পালাবদল ঘটে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরপর এর কয়েকটি নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে সাড়া জাগানো কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে: “প্রলয়োল্লাস, আগমনী, খেয়াপারের তরণী, শাত-ইল্‌-আরব, বিদ্রোহী, কামাল পাশা” ইত্যাদি।
গদ্য রচনা, গল্প ও উপন্যাসনজরুলের প্রথম গদ্য রচনা ছিল “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী”। ১৯১৯ সালের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সৈনিক থাকা অবস্থায় করাচি সেনানিবাসে বসে এটি রচনা করেছিলেন। এখান থেকেই মূলত তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটেছিল। এখানে বসেই বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে: “হেনা, ব্যাথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে”। ১৯২২ সালে নজরুলের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় যার নাম ব্যথার দান। এছাড়া একই বছর প্রবন্ধ-সংকলন যুগবাণী প্রকাশিত হয়।
নজরুল সঙ্গীতনজরুলগীতি বা নজরুল সঙ্গীত বাংলাভাষার অন্যতম প্রধান কবি ও সংগীতজ্ঞ কাজী নজরুল ইসলাম লিখিত গান। তাঁর সীমিত কর্মজীবনে তিনি ৩,০০০-এরও বেশি গান রচনা করেছেন। পৃথিবীর কোনো ভাষায় একক হাতে এত বেশি সংখ্যক গান রচনার উদাহরণ নেই। এসকল গানের বড় একটি অংশ তাঁরই সুরারোপিত।

বিদ্রোহী নজরুল
তখন দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। নজরুল কুমিল্লা থেকে কিছুদিনের জন্য দৌলতপুরে আলী আকবর খানের বাড়িতে থেকে আবার কুমিল্লা ফিরে যান ১৯ জুনে। এখানে যতদিন ছিলেন ততদিনে তিনি পরিণত হন একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীতে। তাঁর মূল কাজ ছিল শোভাযাত্রা ও সভায় যোগ দিয়ে গান গাওয়া। তখনকার সময়ে তার রচিত ও সুরারোপিত গানগুলির মধ্যে রয়েছে “এ কোন পাগল পথিক ছুটে এলো বন্দিনী মার আঙ্গিনায়, আজি রক্ত-নিশি ভোরে/ একি এ শুনি ওরে/ মুক্তি-কোলাহল বন্দী-শৃঙ্খলে” প্রভৃতি। এখানে ১৭ দিন থেকে তিনি স্থান পরিবর্তন করেছিলেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে আবার কুমিল্লায় ফিরে যান। ২১ নভেম্বর ছিল সমগ্র ভারতব্যাপী হরতাল। এ উপলক্ষে নজরুল আবার পথে নেমে আসেন; অসহযোগ মিছিলের সাথে শহর প্রদক্ষিণ করেন আর গান করেন, “ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরবাসী”। নজরুলের এ সময়কার কবিতা, গান ও প্রবন্ধের মধ্যে বিদ্রোহের ভাব প্রকাশিত হয়েছে। এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে বিদ্রোহী নামক কবিতাটি।
কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর রচিত “চল চল চল, ঊর্ধগগনে বাজে মাদল” বাংলাদেশের রণসংগীত হিসাবে গৃহীত। বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তনে তাকে এই উপাধি প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
১৯৭৬ সালে নজরুলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি হতে শুরু করে। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মঙ্গলবার, ২২ মে, ২০১২

প্রতিটি দিনই নজরুলের জন্মদিন / জাহীদ রেজা নূর | তারিখ: ২৩-০৫-২০১২

তুমি বলবে, নজরুল তো বিদ্রোহের কবি, আমি বলব প্রেমের।
তুমি আবৃত্তি করবে ‘সাম্যবাদী’, আমি গাইব ‘এত জল ও কাজল চোখে’।
তুমি আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে ‘রাজবন্দির জবানবন্দী’। আমি তোমাকে শোনাব ‘সখি পাতিসনে শিলাতলে পদ্মপাতা’। 
আমরা দুই মেরুর দুজন মানুষ একসময় বিতর্ক থেকে বেরিয়ে এসে একসঙ্গে পড়ব ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাখানি। একসময় আমরা আবিষ্কার করব, আমরা দুজন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই কথা বলছি। নজরুলের সঙ্গে আরেকটু সখ্য হলে দেখব, একই বৃন্তে যে দুটি কুসুম ফুটিয়েছেন তিনি, তা বিদ্রোহ আর প্রেমের গলিত-মিলিত স্রোতোধারা। বাঁধনহারা বুঝি একেই বলে! 
নজরুল আসলে গতির অন্য নাম। সময়কে হাতের মুঠোয় রেখে তাল-ছন্দ-লয় নিয়ে বিশ্ব কাঁপিয়েছেন। সৃষ্টিসুখের কী উল্লাস তাঁর! আর আবেগের মূর্ছনায় ভেসে গেল সব। তুমি আর আমি একমত হব, কবিতায়-গানে তিনি মুসলমান জাগরণের কথা বলেছেন যেমন, তেমনই ভারতীয় লোককথা, পুরাণেরও আশ্রয় নিয়েছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি ‘জাহান্নামের’ আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসছেন, সেখানেই ‘বিদ্রোহী’ ভৃগু হয়ে ভগবানের বুকে এঁকে দিচ্ছেন পদচিহ্ন। আমরা আরও বিস্মিত হব এই দেখে যে, নজরুল লিখছেন ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এল রে দুনিয়ায়’। 
এখানে বিস্মিত হওয়ার কী আছে? প্রশ্ন করবে তুমি।
আমি বলব, ভেবে দেখো, তিনি দোজাহান বলছেন না, বলছেন ত্রিভুবন। এভাবেই তিনি খেলছেন ‘এ বিশ্ব লয়ে’।

২.
১৯৭৩ সালের একদিন। ধানমন্ডির কবিভবনে গিয়েছিলাম আমরা। একেবারে শিশুর মতো একজন মানুষ বসে আছেন খাটে। হারমোনিয়াম নিয়ে শিল্পী ফিরোজা বেগম গান করছেন। কবির মাথা একটু একটু দুলছে। আমরা কতিপয় শিশু তন্ময় হয়ে দেখছিলাম আমাদের জাতীয় কবিকে। আমাদেরই তিন বছুরে একজনের মাথায় হাত রেখেছিলেন দেখে আমরা আনন্দ পেয়েছিলাম খুব। পরদিন স্কুলে গিয়ে সেই বিশাল অর্জন ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম বন্ধুদের সঙ্গে।
সেই আমরাই ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট বেতারে শুনতে পেলাম, কবি আর নেই। ঢাকা শহরের মানুষ তখন ছুটছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির দিকে। সেই মানুষের ঢলে স্রোতের মতোই ভেসে চলি আমরা কয়েকজন। একনজর দেখা হয় নজরুলকে। তখনো বুঝিনি, এখন বুঝি, এই ইতিহাসের একটু অংশের অংশীদার হয়েছি আমরা। 

৩.
তুমি বলবে, নজরুলের জন্মদিনে মৃত্যুদিনের কথা কেন?
আমি বলব, নজরুলের কি মৃত্যু হয় কখনো? প্রতিদিনই নজরুলের জন্মদিন। প্রতিটি দিনই নজরুলকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া!

যৌবনের গান / কাজী নজরুল ইসলাম

২৫ মে কাজীনজরুল ইসলামের জন্মদিন। দিবসটি উপলক্ষে কবির ‘যৌবনের গান’-এর অংশবিশেষ পাঠক বন্ধুদের জন্য তুলে দেওয়া হলো। নজরুল এখনো প্রাসঙ্গিক, নজরুল এখনো আমাদের সময়ের দাবি পূরণ করছেন।

বার্ধক্য তাহাই—যাহা পুরাতনকে, মিথ্যাকে, মৃত্যুকে আঁকড়িয়া পড়িয়া থাকে, বৃদ্ধ তাহারাই—যাহারা মায়াচ্ছন্ন নব মানবের অভিনব জয় যাত্রার শুধু বোঝা নয়, বিঘ্ন; শতাব্দীর নব যাত্রীর চলার ছন্দে ছন্দ মিলাইয়া যাহারা কুচকাওয়াজ করিতে জানে না, পারে না; যাহারা জীব হইয়াও জড়; যাহারা অটল সংস্কারের পাষাণস্তূপ আঁকড়িয়া পড়িয়া আছে। বৃদ্ধ তাহারাই যাহারা নব অরুণোদয় দেখিয়া নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে দ্বার রুদ্ধ করিয়া পড়িয়া থাকে। আলোক-পিয়াসী প্রাণ চঞ্চল শিশুদের কল কোলাহলে যাহারা বিরক্ত হইয়া অভিসম্পাত করিতে থাকে, জীর্ণ পুঁতি চাপা পড়িয়া যাহাদের নাভিশ্বাস বহিতেছে, অতি জ্ঞানের অগ্নিমান্দ্যে যাহারা আজ কঙ্কালসার—বৃদ্ধ তাহারাই। ইহাদের ধর্মই বার্ধক্য। বার্ধককে সব সময় বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না। বহু যুবককে দেখিয়াছি যাহাদের যৌবনের উর্দির নিচে বার্ধক্যের কঙ্কাল মূর্তি। আবার বহু বৃদ্ধকে দেখিয়াছি যাঁহাদের বার্ধক্যের জীর্ণাবরণের তলে মেঘলুপ্ত সূর্যের মতো প্রদীপ্ত যৌবন। তরুণ নামের জয়-মুকুট শুধু তাহারই যাহার শক্তি অপরিমাণ, গতিবেগ ঝঞ্ঝার ন্যায়, তেজ নির্মেঘ আষাঢ় মধ্যাহ্নের মার্তণ্ডপ্রায়, বিপুল যাহার আশা, ক্লান্তিহীন যাহার উৎসাহ, বিরাট যাহার ঔদার্য, অফুরন্ত যাহার প্রাণ, অটল যাহার সাধনা, মৃত্যু যাহার মুঠিতলে। তারুণ্য দেখিয়াছি আরবের বেদুইনদের মাঝে, তারুণ্য দেখিয়াছি মহাসমরে সৈনিকের মুখে, কালাপাহাড়ের অসিতে, কামাল-করিম-মুসোলিনি-সানইয়াৎ লেনিনের শক্তিতে। যৌবন দেখিয়াছি তাহাদের মাঝে—যাহারা বৈমানিকরূপে অনন্ত আকাশের সীমা খুঁজিতে গিয়া প্রাণ হারায়, আবিষ্কারকরূপে নব-পৃথিবীর সন্ধানে গিয়া আর ফিরে না, গৌরীশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার শীর্ষদেশ অধিকার করিতে গিয়া যাহারা তুষার-ঢাকা পড়ে, অতল সমুদ্রের নীল মঞ্জুষার মণি আহরণ করিতে গিয়া সলিলসমাধি লাভ করে, মঙ্গলগ্রহে, চন্দ্রলোকে যাইবার পথ আবিষ্কার করিতে গিয়া নিরুদ্দেশ হইয়া যায়। পবন-গতিকে পশ্চাতে ফেলিয়া যাহারা উড়িয়া যাইতে চায়, নব নব গ্রহ-নক্ষত্রের সন্ধান করিতে করিতে যাহাদের নয়ন-মণি নিভিয়া যায়—যৌবন দেখিয়াছি সেই দুরন্তদের মাঝে। যৌবনের মাতৃরূপ দেখিয়াছি—শব বহন করিয়া যখন সে যায় শ্মশানঘাটে, গোরস্থানে, অনাহারে থাকিয়া যখন সে অন্ন পরিবেশন করে দুর্ভিক্ষ বন্যা-পীড়িতদের মুখে, বন্ধুহীন রোগীর শয্যাপার্শ্বে যখন সে রাত্রির পর রাত্রি জাগিয়া পরিচর্যা করে, যখন সে পথে পথে গান গাহিয়া ভিখারী সাজিয়া দুর্দশাগ্রস্তদের জন্য ভিক্ষা করে, যখন দুর্বলের পাশে বল হইয়া দাঁড়ায়, হতাশের বুকে আশা জাগায়।
ইহাই যৌবন, এই ধর্ম যাহাদের তাহারাই তরুণ। তাহাদের দেশ নাই, জাতি নাই, অন্য ধর্ম নাই। দেশ-কাল-জাতি-ধর্মের সীমার ঊর্ধ্বে ইহাদের সেনানিবাস। আজ আমরা—মুসলিম তরুণেরা— যেন অকুণ্ঠিত চিত্তে মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি—ধর্ম আমাদের ইসলাম, কিন্তু প্রাণের ধর্ম আমাদের তারুণ্য, যৌবন। আমরা সকল দেশের, সকল জাতির, সকল ধর্মের, সকল কালের। আমরা মুরিদ যৌবনের। এই জাতি-ধর্ম-কালকে অতিক্রম করিতে পারিয়াছে যাঁহাদের যৌবন, তাঁহারাই আজ মহামানব, মহাত্মা, মহাবীর। তাহাদিগকে সকল দেশের সকল ধর্মের সকল লোক সমান শ্রদ্ধা করে।
পথ-পার্শ্বের ধর্ম-অট্টালিকা আজ পড় পড় হইয়াছে, তাহাকে ভাঙিয়া ফেলিয়া দেওয়াই আমাদের ধর্ম, ঐ জীর্ণ অট্টালিকা চাপা পড়িয়া বহু মানবের মৃত্যুর কারণ হইতে পারে। যে-ঘর আমাদের আশ্রয় দান করিয়াছে, তাহা যদি সংস্কারাতীত হইয়া আমাদেরই মাথায় পড়িবার উপক্রম করে, তাহাকে ভাঙিয়া নতুন করিয়া গড়িবার দুঃসাহস আছে একা তরুণেরই। খোদার দেওয়া এই পৃথিবীর নিয়ামত হইতে যে নিজেকে বঞ্চিত রাখিল, সে যত মোনাজাতই করুক, খোদা তাহা কবুল করিবেন না। খোদা হাত দিয়াছেন বেহেশত ও বেহেশতি চিজ অর্জন করিয়া লইবার জন্য, ভিখারীর মতো হাত তুলিয়া ভিক্ষা করিবার জন্য নয়। আমাদের পৃথিবী আমরা আমাদের মনের মতো করিয়া গড়িয়া লইব। ইহাই হউক তরুণের সাধনা।

রবিবার, ২০ মে, ২০১২

আবুল বাশার শেখ এর তিনটি কবিতা-


 দয়ার সাগর


 দয়াময় আমি গুনাহ্গার
 ক্ষমা কর তুমি মোরে,
 সারা জীবন চলতে চাই
 তোমারই পথ ধরে।
 চলার পথে যা করি
 সবই যেন হয় তোমার,
 দিন কায়েমের তরে তুমি
 জীবনটা নাও আমার।
 তোমার পথের শত্রু যারা
 পাবেনা ক্ষমা কভু,
 আল্লাহ তুমি দয়ার সাগর
 সারা জাহানের প্রভু।
  
 তাং- ২০/ ০৫/ ১২ ইং

জনমত


 জিনিস পত্রের দাম
 প্রতি দিনই বাড়ছে,
 ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট
 কল কাঠিটা নাড়ছে।
 গণতন্ত্র লুণ্ঠিত
 বিপন্ন মানবতা,
 জোর যার মুল্ল ুক তার
 এ নীতি যথা-তথা।
 নিম্ন আয়ের মানুষ যারা
 কষ্টে কাটে তাদের দিন,
 তাদের কথা কেউ ভাবেনা
 বক্তিতাতে হয় মলিন।
 উলট পালট কথা ছেড়ে
 দেশের কথা ভাবেন,
 সত্যিকারের উন্নয়নে 
 জনগণকে পাবেন।
   
 তাং- ২০/ ০৫ / ১২ ইং


নীতি কথার পরাজয়
 
 রক্ষক যদি ভক্ষক হন
 কেমন করে চলবে দেশ,
 স্বাধীন দেশের স্বাধীনতা
 এক নিমিষেই হবে শেষ।
 ক্ষমতা আসে যার হাতে
 সেই তো করে লুটতরাজ,
 তারাই ফের প্রতিশ্রুতিতে
 গড়তে চায় এই সমাজ।
 দেশের ভাল ক’জন চায়
 সু-নাগরিক নাম ধারী,
 ক্ষমতা পেলে হাতের মুঠে
 করতে পারে পুকুর চুরি।
 সত্য কথা বলতে গেলে
 দেশদ্রোহী মামলা হয়,
 নীতি কথা পাথর চাপায়
 বরণ করে পরাজয়।

রাত জাগা / জীবন সহোদর- ,আবুল বাশার শেখ


রাত জাগা 
  

 সেলফোন খোলা রেখ

 রাত বারটায়,
 কথা হবে নিরিবিলি
 মন যদি চায়।
 ভাল লাগা ভালবাসা
 হবে লেনা-দেনা,
 মনের লোকানো কথা
 তাও হবে জানা।
 না হয় দিও তুমি 
 দু’টি মিস্ডকল,
 মিষ্টি গানের সুরে
 পাবে তার ফল।
 ডাহুক পাখির মত
 থাকবো জেগে,
 গুপ্ত প্রেমের দেখা
 পাবে যে ত্যাগে।
  অপেক্ষা শুরু হলো
 ভাবনা তোমার,
 ভেবে দেখ এ জীবনে
 হবে কি আমার!
 তাং- ১৭ / ০৫ / ২০১২ ইং

 জীবন সহোদর


 বাস্তবতার একটি সিঁড়ি খুব প্রয়োজন

 স্থাপত্য শৈলির রূপরেখা অনন্য যার বৈশিষ্ঠ্য,
 যা স্থাপিত হবে মনের গহীনে।
 ভাগ করা যায় কি জীবন!
 প্রতারণা যখন চৌদিক ঘিরে রাখে
 তখন জীবনে নেমে আসে ঘন অন্ধকার। 
 বুঝেনা যখন কেউ জীবনের সরলতা 
 জীবন সহোদর সীমানা পেরিয়ে চলন্ত ট্রেনের
 মত বেঈমানী করে। 
 অবুঝ বালক সেঁজে বসে থাকি।
  তাং- ১৭/ ০৫ / ১২ ইং

এ কোন্ দেশ / আবুল বাশার শেখ


এ কোন্ দেশ //
 
 স্বাধীন না কি আমরা সবাই স্বাধীন
 ভেবে দেখেন একটি বার
 কেমন করে যাচ্ছে দিন।
 ঘর থেকে বের হতে গেলেই ভাবনা হাজার
 কেমন করে অফিস যাবো করবো নিত্য বাজার!
 মাথার উপর অস্ত্র ঠেকায় দিন দুপুরে
 ভাল মন্দ যায়না চেনা দেখে উপরে।
 তার উপরে হতে হয় যদি অপহরণ
 জানা যাবে না কোথা যে কার হবে মরণ।
 চলার পথে সকল সময় ভয় থাকে যে মনে
 স্বাধীনতা কোথায় পাব জিজ্ঞাসী জনে জনে।
 পাইনা খোঁজে সঠিক উত্তর মনগড়া সব মত
 স্বাধীনতা পাব কোথায় জানতে চাই অভিমত।

তাহলে আমি কে ? // সোহেল চৌধুরী


আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, সবাই আমাকে বলত, "তুই একটা জ্বিন"
সবাইতো যেমন তেমন- আমার বাবাও একদিন রেগে গিয়ে বললেন, "তুই একটা শয়তানের বাচ্চা"
ভাবলাম, শয়তান+বাচ্চা= শয়তানের বাচ্চা
অর্থাত? আমার বাবা একটা শয়তান !
যেহেতু ছোট ছিলাম আর বুদ্ধি ছিল তীক্ষ্ণ
বাবাকে প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা বাবা, শয়তান কি ম্যাসক্যুলিন - নাকি ফ্যামিনিন ?
বললেন, "চুপ ! বান্দরের বাচ্চা !!! "
যাক, বাবার বংশধারা নিয়ে ভাবতে আর ইচ্ছে হলোনা !
একটু বড় হলে, মায়ের জোড়াজোরিতে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হয়েছি
একদিন টিচার আমার পিঠ চাপড়ে বললেন "ইউ আর জিনিয়াস"
শব্দটি বহু শুনেছি, কিন্তু কি যেন একটা যোগ হলো (?)
মানে, জীন+ইয়াস= জিনিয়াস
তার মানে কি? আমি কী ইয়াস নামক জ্বিন ? নাকি ইয়াস মানে জ্বীনের বিপরীতটা ??
সমস্যায় পড়লাম, দ্বিধায় পড়লাম
তাহলে আমি কে ?
আমি একটা জ্বিন